ভয়ংকর সৌন্দর্যের পাহাড়ি পথে

রাত এগারটা দশে কমলাপুর থেকে গাড়ি ছাড়ে। মাঝরাতে কুমিল্লায় এক বিখ্যাত রেষ্টুরেন্টে ব্রেক। তেল ছাড়া পারাটা আর গরু গোস্ত ভূনা! অবশ্য মুখে দিতেই কম্ব সারা, বহুক্ষণ চিবিয়েও যেন গলা দিয়ে নামে না। যাক বাবা কি আর করা, পকেট থেকে খোয়া গেল বেশ কিছু টাকা ! সকাল ৮টা ২০ মিনিটে খাগড়াছড়ির দিঘীনালা বন বিহারের সামনে পৌঁছে  যাই। শ্রমিক নেতা সুনিল দা— মান্ধাতা আমলের চান্দের গাড়ি নিয়ে আগে থেকেই রেডি।

অতঃপর কিছুটা সময় বনবিহারে সৌন্দর্য দর্শন। সেল ফোনে মফিজ ভাইয়ের তাড়া, একটু তাড়াতাড়ি আসেন না ভাই, বাজারসদাই করে যেতে হবে সাজেক ভ্যালি। চান্দের গড়ি স্টার্ট দিয়ে দশ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাই গেস্ট হাউসে, সাফসূতর, নাশতা আর বাজারসদাই চলে সমান তালে। চাল-তেল-মুরগি গাড়িতে তোলে নিই।

সবকিছু পিছনে ফেলে গাড়ি ছুটছে সাজেক ভ্যালি! খাগড়াছড়িকে বিদায় দিয়ে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি আর্মি ক্যাম্পে পৌঁছে ব্রেক। খুব সময় লাগলো না নাম-ঠিকানা এন্ট্রি করতে! অথচ ২০০৪ সনে যখন যাই, তখন প্রায় ঘন্টাখানেক জেরা করে তারপর অনুমতি পাই। গঙ্গারাম মুখ নন্দরাম পাড়া পেরিয়ে নিরিবিলি পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে গাড়ি চলে, যতই এগিয়ে যাই, ততই সামনের পাহাড় যেন দূরে সরে যায়। কখনো চারপাশের মায়াময় প্রকৃতির রূপে আছন্ন হয়ে পড়ি।

কাচালং নদী পেড়িয়ে মাচালং বাজারে খনিকটা সময় বিরতি। কচি ডাবের পানি আর পাহাড়ি বালিকা তরুণীদের সঙ্গে চলে অম্ল-মধুর খুনসুটি। সাজেক পৌঁছার ঠিক ৫ কি.মি. আগে পথের এমন  সৌন্দর্য যে, সেখানে গাড়ি ব্রেক না করে উপায় কী। চলে একেক জনের ইচ্ছে মত সেল্ফি। টঙ দোকান থেকে বাংলা কলা পেটে পুরে আবার চলতে শুরু করি। একটা সময় মনে হল যেন আকাশটাকে ধরে ফেলছি। তবে ধরার আগেই পৌঁছে যাই সাজেকের প্রথম পাড়া রুইলুইতে। প্রথম দেখাতেই চোখ কপালে। জনপ্রতি বিশ টাকায় টিকেট কেটে ঢুকে পড়ি ভেতরে। কৃত্রিম আর প্রাকৃতি— এই দুয়ের মিশ্রণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখানটায় এনে দিয়েছে এক অন্যরকম রূপ। দেখলে মনে হবে, সাজেক ভ্যালি যেন কোন উন্নত দেশের পাহাড়ি জনপথের প্রতিচ্ছবি ।
pic_ma1_507298822
আমাদের রাতে থাকার জন্য ঠাঁই  হয় সাজেক ক্লাব হাউজে । কাঁধের-পিঠের ঝোলা রেখে বের হয়ে পড়ি সাজেক দর্শনে। কখন খেতে আসব জানতে চাইলে, রসুই ঘর থেকে খবর আসে ঘুরতে থাকেন মনের সুখে!  ফলে পেটে কিছু দিতে ঢু মারি চায়ের দোকানে। চানাচুর, বিস্কুট, সঙ্গে এক কাপ লিগার চা। তারপর বিমুগ্ধ নয়নে সাজেকের রূপ দেখি আর বিগত দশ বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে ফিরি । সরকার চাইলে কী-না পারে, তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই সাজেক ভ্যালি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৭০০ ফিট উচ্চতার সাজেক ভ্যালি এখন দেশের অন্যতম দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্র। দৃষ্টির শেষ সীমা পর্যন্ত সাজেকের ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সৌন্দর্য। বসন্তের ছোঁয়ায় পাতা ঝরা গাছগুলো যেন একেকটি শিহরণ জাগানো ছবি। সাজেকের আইকন বিজিবি পরিচালিত রূন্ময় কটেজটি সাজেকের রূপের পসরায় যোগ করেছে আশ্চর্যরকম ভাল লাগা। পাহাড়ের গায়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পিচ ঢালা পথ গিয়ে শেষ হয়েছে বিজিবি ক্যাম্প পর্যন্ত। সাজেক ভ্যালি হলো বাংলাদেশের সব চাইতে বড় ইউনিয়ন। দূর্গম সাজেক আজ পরিণত হয়েছে সৌখিন ভ্রমণ পিপাসুদের তীর্থে

ছুটি কংলাকের পথে। ঝিপে মাত্র ১০ মিনিটের পথ, এরপর ১৫ মিনিটের চড়াই-উৎরাই। কংলাক সাজেকের সবচেয়ে উঁচু সিপ্পু পাহাড়ে অবস্থিত। শুধু সাজেক ভ্যালি নয় পুরো রাঙ্গামাটির  জেলার মধ্যে উচুতম পাহাড়। এর উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে প্রায় ২৮০০ ফিট।

কংলাকের প্রকৃতি যেন আরো একটু বেশিই উদার। হয়তো কংক্রিটের আলিঙ্গনে এখনো নিজেকে জড়ায়নি, তাই। পাহাড়ের চূড়া থেকে ঢেউ খেলানো পাহাড়ের বুকে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি কমলার বাগান। নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের আধার সাজেক ভ্যালি পুরনো সেগুন গাছ, বাঁশ বন আর প্রাচীন বটবৃক্ষের মায়াবি পরশে ঘেরা। সাজেকের রুইলুই ও কংলাক পাড়ায় মোট ৯৬টি পরিবারের বসতি। এদের বেশির ভাগই লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠী। প্রতিটি বাড়িই সাজানো গুছানো। বাড়ির আঙ্গিনায় ফুটে আছে নানান রঙের ফুল। সাজেকের হেডম্যান লাল থ্যাঙ্গগা লুসাইর সঙ্গে কথা বলে আদিবাসিদের সম্পর্কে জানা হলো। রুইলুই ও কংলাক এই দুই পাড়ার আদিবাসিরা অধিকাংশই ইংরেজি শিক্ষিত। পাশেই ভারতের মিজোরাম প্রদেশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ বেশি। অধিকাংশ বসিন্দা পড়ালেখাসহ হাটবাজার পর্যন্ত মিজোরাম থেকেই করে থাকেন। তাদের পোশাক ও আচার-আচরণ আধুনিক। অত্যন্ত বিনয়ী স্বভাবের আদিবাসি মানুষগুলো এক কথায় বন্ধুবৎসল। পুরো বিকেলটা কংলাক পাড়ার সিপ্পু পাহাড়ের চূড়ায় কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরি ক্লাব হাউজে।

রাতে হবে বার-বি- কিউ, সঙ্গে ক্রিকেটে ভারত হেরেছে সেই আনন্দে মাওকা ডেন্স! রাত নয়টা, শুরু হয় আয়োজন। সবাই অনন্দে প্রাণ খুলে নাচলও অনেক রাত পর্যন্ত। রাত প্রায় একটা পর্যন্ত চলা আনন্দ-উল্লাস শেষে যাই ঘুমাতে। উঠতে হবে ৪.৩০ মিনিটে, দেখতে হবে পুব আকাশের প্রান্ত থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য। কিন্তু হায়! চাইলেই কি আর ঘুমানো যায়! নাক ডাকা শিল্পিদের শুরু হয় হরেক কিসিমের কর্কশ আওয়াজ তোলার কেরামতি।

দে-ছুটের বন্ধুরা সাজেক রিসোর্টের পাশে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছি পূর্ব দিগন্তে। ৫টা ২০মিনিট, আকাশে সূর্যের লালীমা কিন্তু মিজোরাম পাহাড় ডিঙিয়ে সূর্য দেখা দিতে সময় নেয় বেশ খানিক। আমরাও নাছোড়বান্দা। সকাল ৫.৪০ মিনিটে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত সূর্যোদয়। ধীরে ধীরে মিজোরাম পাহাড়টাকে নীচে রেখে লাল টকটকে সূর্য উঁকি দেয় আকাশে। সেই সূযোদয়ের দৃশ্যের বর্ণনা ভাষায় দেয়ার ক্ষমতা নেই আমার। দার্জিলিংয়ের টাইগার হিল থেকেও দেখেছি, এবার আমাদের নিজ ভূখণ্ড সাজেক থেকেও দেখলামম, অপরূপ।

কীভাবে যাবেন
সাজেক রাঙামাটি জেলায় হলেও যোগাযোগের সুবিধা খাগড়াছড়ি দিয়ে। ঢাকা থেকে বাসে সরাসরি খাগড়াছড়ির দীঘিনালা বাজার। সেখান থেকে চান্দের গাড়িতে সাজেক ভ্যালি। বাস ভাড়া ৫৮০ টাকা। চান্দের গাড়ি রিজার্ভ ৪,০০০ টাকা। পরের দিন ফেরার জন্যে গাড়ি রেখে দিলে সেক্ষেত্রে ৬,৫০০ থেকে ৭,০০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন
কম টাকায় বিশাল বহর নিয়ে থাকতে চাইলে সাজেক ক্লাব হাউস, ভাড়া মাথা পিছু ২০০ টাকা। তবে পুরো হাউস রিজার্ভ করতে চাইলে অল্প কিছু টাকা বেশি গুণে থাকা যাবে আয়েশি ঢঙে। এছাড়া রয়েছে সেনাবাহিনী পরিচালিত সাজেক রিসোর্ট ও বিজিপি পরিচালিত সাজেকের আইকন রুন্ময় কটেজ। অগ্রীম বুকিং ও মৌসুম অনুযায়ী রুম ভাড়া জানার জন্য নেটে সার্চ দিলেই যাবতীয় তথ্য পাওয়া যাবে।

কী খাবেন
যদি সাজেকে দু-তিনদিন থাকার ইচ্ছে থাকে তাহলে খাগড়াছড়ি দিঘীনালা হতে বাজার সদাই করে নেয়া ভাল এছাড়া  বেশ কিছু রেষ্টুরেন্টও রয়েছে।

টিপস
অতিরঞ্চিত কিছু করা হতে বিরত থাকুন।
দলে  কম সংখ্যক সদস্য রাখুন।
আদিবাসিদের সঙ্গে যথা সম্ভব মার্জিত আচরণ করুন।
প্রকৃতি ও পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোন বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলবেন না।

মূল আকর্ষণ
দীঘিনালা হতে সাজেক যাওয়ার পথের সৌন্দর্য দেখতে চাইলে মাঝে মধ্যেই গাড়ি ব্রেক করবেন। এমনও হতে পারে সাজেক পর্যটন কেন্দ্রের চাইতে সাজেক যাওয়ার পথের নয়নাভিরাম সৌন্দর্য আপনাকে বেশি মুগ্ধ করবে।